ঢাকা , মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬ , ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি সময় চুরি করে, ক্লিনিকে মৃত্যু বাণিজ্য করছে সফিয়ার

স্টাফ রিপোর্টার
আপলোড সময় : ০১-০৫-২০২৬ ০৮:৩৪:০৭ অপরাহ্ন
আপডেট সময় : ০১-০৫-২০২৬ ০৮:৩৪:০৭ অপরাহ্ন
সরকারি সময় চুরি করে, ক্লিনিকে মৃত্যু বাণিজ্য করছে সফিয়ার চিকিৎসার এক ‘মরণ সাম্রাজ্য
মোঃলিখন ইসলাম (নীলফামারী প্রতিনিধি): সরকারি কর্মঘণ্টা চুরি আর দায়িত্বের ফাঁকি দিয়ে নীলফামারীর ডিমলায় চিকিৎসার এক ‘মরণ সাম্রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন বিতর্কিত কম্পাউন্ডার মো. সফিয়ার রহমান। সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তিমূলক বদলিতে থেকেও কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকে তিনি নিজের ক্লিনিকে সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন মরণখেলা। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভুল রিপোর্ট আর অব্যবস্থাপনায় প্রসূতি মৃত্যুতে এখন দিশেহারা সাধারণ মানুষ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কম্পাউন্ডার হিসেবে বর্তমানে শাস্তিমূলক বদলি ও সাসপেন্ডে রয়েছেন সফিয়া রহমান। বদলি ও সাসপেনশনের বিধি মোতাবেক নিয়মিত অফিসে উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও তিনি তা মানছেন না। অফিস কর্তাদের ম্যানেজ করে মাসে দু-চার দিন উপস্থিত থেকে পুরো এক মাসের স্বাক্ষর করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এভাবেই অফিস ফাঁকি দিয়ে নিজ উপজেলা ডিমলায় 'রহমান প্রেসক্রিপশন সেন্টার' ও 'ডিমলা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিক' নামে বেসরকারি দুটি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তাঁর স্ত্রীকে মালিক দেখিয়ে। ডিমলা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পর সিজারিয়ান অপারেশনের ডিগ্রিধারী চিকিৎসক এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ ও যোগ্য জনবল না থাকায় হরহামেশাই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও ডিমলা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিকের বিভিন্ন টেস্টের রেজাল্টেও আকাশ-পাতাল তফাৎ দেখা দেয়। ভুক্তভোগী আসাদুজ্জামান আসাদ জানান, "আমার স্ত্রী তুলির ডিমলা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার এন্ড ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়। অপারেশনের পর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন যে মা ও নবজাতক দুজনেই ভালো আছে। বেলা ১১টার দিকেও তারা বলেন রোগী ভালো আছে, শুধু সামান্য ব্লিডিং হচ্ছে। কিন্তু কিছু সময় পরই ক্লিনিকটি থেকে জানানো হয় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে এজন্য তুলিকে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা আমার স্ত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ক্লিনিকটির অবহেলাই আমার সাজানো সংসার শেষ করে দিল।" আরেক ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলমের অভিযোগ করে বলেন, ডিমলা স্কয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গত ১৫ এপ্রিল চিকিৎসা নিয়েছেন জাহাঙ্গীর আলম নামে এক রোগী। তিনি জানান, "আমি মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি প্রতিষ্ঠানে রক্ত পরীক্ষা করিয়েছি। ডিমলা স্কয়ার ক্লিনিকে আমার বিলিরুবিন এল ২৬.২, অথচ সোহেল ডায়াগনস্টিকে ১০.৫ এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এল ১২.৫। একই মানুষের শরীরে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে রিপোর্টে এমন আকাশ-পাতাল পার্থক্য কীভাবে সম্ভব? এখন আমি কোন রিপোর্টের ভিত্তিতে চিকিৎসা নেব? ভুল রিপোর্টের কারণে যদি ভুল চিকিৎসা হয়, তবে আমার জীবনের ঝুঁকি কে নেবে? এই বিভ্রান্তিতে আমি আর আমার পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।" রাব্বীনা আক্তার সৃষ্টি নামে এক প্রসূতির সিজারিয়ান অপারেশনের পর অ্যাকিউট ইনটেস্টিনাল অবস্ট্রাকশন বা অন্ত্রে তীব্র বাধা এবং তীব্র সংক্রমণ (Acute infection) দেখা দেয়। সিজার-পরবর্তী সঠিক পর্যবেক্ষণের অভাব, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং উন্নত চিকিৎসায় বিলম্ব তাঁর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে। সম্প্রতি ডিমলা স্কয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টার অ্যান্ড ক্লিনিকের বিরুদ্ধে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে অপারেশন-পরবর্তী জটিলতার একটি সম্মিলিত ফলাফল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কম্পাউন্ডার মো. সফিয়ার রহমান জানান, ঔষধ চুরির যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে, তা নিয়ে এখনো আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাকে এই ঘটনায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে। বর্তমানে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ও অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, তিনি অফিস করছেন না এ কথা বললে ভুল হবে রবিবার-সোমবার অফিস করছেন। তাঁদের অফিসের ডিজিটাল হাজিরা (ফিঙ্গার প্রিন্ট) মেশিনটি বর্তমানে নষ্ট হয়ে আছে। একারণেই তিনি হাতে লিখে হাজিরা দিচ্ছেন। তবে তাঁর স্ত্রীর নামে পরিচালিত বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অব্যবস্থাপনা এবং সেখানে রোগীর মৃত্যুর অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান। এক পর্যায়ে বিরক্তি প্রকাশ করে তিনি নয়া দিগন্তের প্রতিবেদককে বলেন, “এত ডিভলি (গভীরভাবে) কেন?” কথাটি বলে তিনি ফোনটি কেটে দেন। এ বিষয়ে বোচাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: বিজয় কুমার রায় জানান, সফিয়ারের বিরুদ্ধে ডিমলায় একটি দুর্নীতি মামলা চলমান রয়েছে। ওই মামলার প্রেক্ষিতে তাকে সাময়িক বরখাস্ত (সাসপেন্ড) করে বোচাগঞ্জে পোস্টিং দেওয়া হয়েছিল। বিধি মোতাবেক তার নিয়মিত অফিস করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে ঠিকমতো কর্মস্থলে আসে না। ডা: বিজয় কুমার রায় আরও জানান, চলতি মাসে সফিয়ার মাত্র ২ দিন অফিসে উপস্থিত থাকলেও হাজিরা খাতায় ৪ দিনের উপস্থিতি দেখিয়েছে। এই অনিয়ম ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার বিষয়টি ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি নয়া দিগন্তকে নিশ্চিত করেছেন। দিনাজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. আসিফ ফেরদৌস এ বিষয়ে জানান,‌ সফিয়ার বর্তমানে সাময়িকভাবে বরখাস্ত অবস্থায় আছেন। বিধি অনুযায়ী, সাময়িকভাবে বরখাস্ত থাকা সত্ত্বেও তাকে নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সফিয়ার কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকলে তার বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে চুরি হওয়া সরকারি ওষুধের একটি ঘটনায় দুইটি বস্তায় উদ্ধার করা হয় ১৩ প্রকারের মোট ২০ হাজার ৩৩০ পিস ওষুধ, যার আনুমানিক মূল্য ছিল প্রায় দুই লাখ টাকা। ওই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেন তৎকালীন ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কম্পাউন্ডার মো. সফিয়ার রহমান। পরবর্তীতে তাকে শাস্তিমূলক বদলি ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : News Upload

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ